বিএনপি’র ইফতারে রাজনৈতিক দলের মিলনমেলা, উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমান

দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে ইফতারের আয়োজন করেছে বিএনপি। গতকাল রাজধানীর ইস্কাটনের লেডিস ক্লাবে আয়োজিত ইফতার মাহফিলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন। জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, নাগরিক মঞ্চ, বিএনপির সমমনা দল ও জোটের নেতারা ইফতারে অংশ নেন।

ইফতার-পূর্ব আলোচনায় তারেক রহমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বলেন, ধর্মীয় উগ্রবাদীদের অপতৎপরতা এবং চরমপন্থা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পরিচয় দিলে উগ্রবাদী জনগোষ্ঠী এবং পরাজিত ফ্যাসিবাদী অপশক্তি দেশে পুনরায় গণতন্ত্রের কবর রচনা করবে। অন্যদিকে, গণতান্ত্রিক বিশ্বে বাংলাদেশ ভাবমূর্তি সংকটের মুখোমুখি হতে পারে। দেশের অসম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চরিত্র সমুন্নত রাখতে চরমপন্থা এবং ধর্মীয় উগ্রবাদী অপশক্তিতে প্রতিহত করার পাশাপাশি গণহত্যাকারী পলাতক মাফিয়া চক্রকে যেকোনো মূল্যে বিচারের সম্মুখীন করার মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা শক্তিশালী করাই হবে বিএনপিসহ গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তির আগামী দিনের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত।

রাজনীতিবিদদের উদ্দেশ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, “আমাদের সকলের চিন্তাভাবনা ও ধ্যানধারণা একই রকম নাও থাকতে পারে। আমাদের মধ্যে ভিন্ন রাজনৈতিক চিন্তা রয়েছে, ভিন্ন দল-মত-দর্শন রয়েছে। তবে মতে ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আমরা কিন্তু সবাই একসঙ্গে বসেছি। এটাই আমাদের বাংলাদেশ। এটি আবহমানকালের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের এক অনন্য প্রতিফলন। তবে দুঃখজনকভাবে গত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণে দেশের শুধুমাত্র শিক্ষা ব্যবস্থা, রাজনীতি, অর্থনীতি এসব কিছুকেই ধ্বংস করে দেয়নি, বরং বাংলাদেশের আবহমানকালের ধর্মীয় সামাজিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকেও ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। সামাজিক সম্প্রীতি ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে নষ্ট করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, “গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের ধারাবাহিকতায়, জুলাই-আগস্টে সাহসী জনগণের রক্তাক্ত বিদ্রোহে মাফিয়া সরকার পালিয়ে যায়। মাফিয়া সরকারের পতনের পর সাত মাস কেটে গেছে। সম্ভবত দীর্ঘ দেড় দশক ধরে মাফিয়া শাসনের শোষণে বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে মেরামত করার জন্য এটি খুব বেশি সময় নয়। তবে, আগামী দিনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রম বা কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা যদি জনগণের সামনে আরও স্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্ট হত, তাহলে জনগণের মনের সকল সন্দেহের অবসান হত।”

তারেক রহমান বলেন, শুধুমাত্র একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্যই মাফিয়া সরকারের পতন ঘটেনি-এ কথা যেমন সত্য, তার চেয়েও আরও চরম সত্য হয়তো একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন না করার জন্যই মাফিয়া সরকারের নির্মম পতন হয়েছিল। সুতরাং একটি নির্বাচনকে শুধুমাত্র কোনো একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যাওয়া না যাওয়ার বিষয় হিসেবেই বিবেচনা করার অবকাশ নেই। প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে জনগণ যার যার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার সুযোগ পান। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা জনপ্রতিনিধিত্বশীল সংসদ এবং সরকার গঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সর্বোপরি, প্রতিটি সফল ও কার্যত নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারের সঙ্গে নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারের চুক্তি, নবায়িত রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের মালিকানা সম্পর্ক গভীরতর হয়। রাষ্ট্রে জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিএনপিসহ গণতন্ত্রের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সোচ্চার।

তিনি বলেন, বিএনপি সহ প্রতিটি রাজনৈতিক দল বিশ্বাস করে যে সংস্কার এবং নির্বাচন উভয়ই প্রয়োজনীয়। অতএব, সংস্কার এবং নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নীতি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী এবং বাস্তবায়নের উপায় কেবল সংস্কারের উপর নির্ভর করে। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নীতি ব্যবস্থাপনা দৈনন্দিন গণতান্ত্রিক অনুশীলনের উপর জোরদার হয়। বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায়, রাজনীতিবিদরা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনা করেন। জনগণের রায়কে অবিশ্বাস করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত দুর্বল করে গণতান্ত্রিক আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

সভাপতি হিসেবে তার ভাষণে, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার প্রস্তাবগুলি ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলির কাছে পৌঁছেছে। আমি আপনাদের অনুরোধ করছি যে আপনি সেগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করুন এবং আপনার মতামত জানান। যাতে আমরা সকলকে নিয়ে এগিয়ে যেতে পারি। তিনি বলেন, আজ আমরা খুবই কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। যদিও আমাদের ফ্যাসিবাদমুক্ত পরিবেশ রয়েছে, তবুও আমরা এখনও গণতন্ত্রের দিকনির্দেশনা খুঁজে পাচ্ছি না। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রধান আকাঙ্ক্ষা। ঐক্যের উপর জোর দিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, এই মুহূর্তে ঐক্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা। তিনি জনগণের ভোটে বিএনপি নির্বাচিত হলে দলের ৩১ দফা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও দেন। গণতন্ত্রের পথে যাওয়ার বিকল্প নেই। বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমি স্পষ্টতই আগাম নির্বাচনের কথা বলছি কারণ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার গঠন করা যেতে পারে। নির্বাচিত সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার করবে।

জাতীয় নাগরিক দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “ফ্যাসিবাদী শক্তি এবং তাদের মিত্ররা এখনও বাংলাদেশে বিভিন্ন স্থানে রয়ে গেছে। আমরা যেমন বলেছি, ফ্যাসিবাদী সিস্টেমটা পাল্টাতে হবে। বাংলাদেশের নেতৃত্ব আগামীতে যার হাতেই যাক না কেন, একটি পরিবর্তিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। তিনি বলেন, একটি কথা বলা হচ্ছে যে, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন (ইনক্লুসিভ ইলেকশন), আমি মনে করি একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার মতো, দেশের মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করার মতো রাজনৈতিক দল বা পক্ষ বাংলাদেশে রয়েছে। ৫ই আগস্ট যে শক্তিকে বাংলাদেশের মানুষ পরাজিত করেছে, মুজিববাদ ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে বিতাড়িত করেছে, আগামীতে বাংলাদেশের ভবিষ্যত রাজনীতি ও নির্বাচনে সেই মুজিববাদী রাজনীতির কোনো স্থান হবে না।

এনসিপি’র আহ্বায়ক বলেন, একটি বিচার প্রক্রিয়া চলমান আছে, সেই বিচারের আগে রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ প্রশ্নই উঠে না। আমি রাজনৈতিক দলের প্রতি এই আহ্বানটাও রাখবো যেন এই বিষয়ে আমরা একটি রাজনৈতিক ঐকমত্যে আসতে পারি। আমরা সবসময় এমন এক বাংলাদেশ প্রত্যাশা করেছি, যেখানে রাজনৈতিক শক্তিগুলো, তাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, নীতিগত পার্থক্য, সমালোচনা থাকবে। কিন্তু সবাই একসঙ্গে বসতে পারবো, আলোচনা করতে পারবো দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে। নাহিদ ইসলাম বলেন, যখন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে বসার মতো অবস্থা থাকে না, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভেতরে যদি অনৈক্য তৈরি হয় সেখানে অরাজনৈতিক শক্তিগুলো সুযোগ সন্ধানী হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা বিভিন্ন সময় দেখেছি, এটা হয়েছে। আমরা মনে করি এখন যে পরিবেশ, পরিস্থিতি রয়েছে সেখানে রাজনৈতিক ঐক্যটা থাকবে।

জামাতের নায়েবে আমির ড. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, বাংলাদেশ আজ একটি পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ৫ আগস্ট আমরা বিশাল সাফল্য অর্জন করেছি। এর মূলে ছিল সকল শ্রেণীর মানুষের ঐক্য। আমি মনে করি জাতীয় ঐক্য ভবিষ্যতে বাংলাদেশের একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের জন্য এখনও সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হবে। এই ঐক্য বজায় রেখে, আমরা অবশ্যই এখানকার প্রতিটি স্থান থেকে যা প্রয়োজন তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করব। জামায়াতের পক্ষ থেকে, আমি সকলকে চারটি দফায় জাতীয় ঐক্যের জন্য অনুরোধ করছি। এক. বাংলাদেশে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, এখানে কোনও আপস হবে না, দুই. একটি টেকসই গণতন্ত্র, তিন. একটি সুষ্ঠু নির্বাচন, চার. একটি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ড. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোঃ তাহের, জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, গণফোরামের প্রধান সমন্বয়ক।

ইফতার মাহফিলে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম, বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য বহ্নিশিখা জামালী, জেএসডির সিনিয়র সহ সভাপতি তানিয়া রব, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য সুব্রত চৌধুরী, ইসলামী ঐক্য জোটের চেয়ারম্যান আব্দুর রকিব, বিএলডিপি’র সভাপতি শাহদাত হোসেন সেলিম, বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, এনপিপি’র চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ড. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী, জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমসহ বিভিন্ন দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া যুগপৎ আন্দোলনের জোট এবং দলগুলোর নেতারাও ইফতার মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন।

বিএনপি’র নেতাদের মধ্যে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, বেগম সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, আবদুল আউয়াল মিন্টু, নিতাই রায় চৌধুরী, শামসুজ্জামান দুদু, ড. আসাদুজ্জামান রিপন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীসহ দলটির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারা ইফতারে উপস্থিত ছিলেন।