জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও পাসপোর্ট অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) মুহাম্মদ ওয়াহিদুল হকের বিরুদ্ধে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ মামলা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার ওয়াহিদুল হকের মোবাইল ফোনে থাকা দুই অডিও রেকর্ডের কারণে ফেঁসে যান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর পদ থেকে সদ্য অপসারিত ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। রাজধানীর গুলশান থেকে ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সাবেক মহাপরিচালক ওয়াহিদুল হককে গ্রেপ্তার করে গুলশান থানা পুলিশ।
ওই সময় তার মোবাইল ফোনটিও জব্দ করে পুলিশ। পরে সেটি পরীক্ষা করতে গিয়ে দুটি অডিও রেকর্ড পাওয়া যায়। ওই অডিওতে তার সঙ্গে ব্যারিস্টার তুরিনের যোগাযোগের তথ্য ছিল।তুরিন সেসময় অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি কোনো জবাব দেননি। ফেসবুক পোস্টে নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও ওই গোপন বৈঠকের কথা তিনি অস্বীকার করেননি।

আরো পড়ুন

Error: No articles to display

নিজের অপসারণের বিষয়ে জানতে চাইলে তুরিন আফরোজ বলেন,আমি বিশ্বাস করি, শতভাগ সততার সঙ্গে আমি কাজ করেছি। আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ দেয়া হয়নি। এমনকি আমার বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ তদন্তে কোনো কমিটি করা হয়েছে কি না সেটিও জানি না। আমার বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, কারা, কীভাবে তদন্ত করে প্রমাণ পেল তা আমি জানি না। আমারও কিছু বক্তব্য আছে, সেটি কেউ শুনলো না। সেদিন কী ঘটেছিল, আরও কেউ জড়িত আছে কি না সেটিও জানতে চাইলো না। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ন্যাচারাল জাস্টিসের বিরুদ্ধে। তারপরও আমি ট্রাইব্যুনালের মর্যাদা নষ্ট হোক সেটি চাই না। বিষয়গুলো সুযোগ পেলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলব।
তুরিন আফরোজকে অপসারণের পর সোমবার বিকালে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেন, এই পদক্ষেপ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, যে মামলা তিনি নিজে করছিলেন, সেই মামলার একজন আসামির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে গিয়েছিলেন।
মামলার আলোচনা করার সময় এও বলেছিলেন যে, এ মামলায় কোনো সারবর্তা নেই। সেই যে কথোপকথন টেপ করা হয়। টেপ করা কথোপকথনগুলো এবং তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অভিযোগ আমাদের কাছে পাঠান। এ অভিযোগ নিয়ে সাক্ষীদের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং ওনার সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন যতটুকু মনে করি হয়েছিল।
তিনি বলেন, যে সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে, সেগুলো কিন্তু অল আর ডকুমেন্টরি। এজন্য আমরা সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অব্যাহিত দিয়েছি। তুরিনের আগের কাজে নিজের সন্তুষ্টির কথা জানিয়ে আনিসুল হক বলেন, যে কারণে আজ তাকে অব্যাহতি দেয়া হল, তার আগ পর্যন্ত তিনি কিন্তু নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে গেছেন।
এ ব্যাপারে তার সেন্স অব জাজমেন্ট কেন কাজ করেনি, আমি জানি না। তার দিক থেকে এসব বক্তব্য সেটা তার গলা বলে প্রমাণিত হয়েছে। এটা উনি কেন করলেন, আমরা বুঝতে পারছি না। এটা দুঃখজনক।
অপসারণের বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, কাজটা যে আমি খুশি হয়ে করেছি, তা না। কিন্তু তাকে অব্যাহতি দেয়াটা জরুরি হয়ে পরে। কারণ যে মামলা নিয়ে কথা হচ্ছে, সেই মামলায় চার্জ গঠন হয়ে গেছে, সেই কারণে আমার মনে হয়, এই ব্যাপারটি একটি নিষ্পত্তি টানা দরকার ছিল। সেজন্য এটা করা হয়েছে।’
অপসারণের আদেশ সম্বলিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে তুরিন আফরোজকে শৃঙ্খলা ও পেশাগত আচরণ ভঙ্গ এবং গুরুতর অসদাচরণের দায়ে অপসারণ করা হয়েছে।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সোমবার এই প্রজ্ঞাপন জারি করে।
এদিকে অপসারণের পর সোমবার বিকালে নিজের ফেসবুকে একটি পোস্ট প্রকাশ করেছেন তুরিন। নিচে পোস্টটি হুবহু তুলে দেয়া হল–
জীবনের অনেক সত্য অপ্রকাশিত থেকে যায়। আমি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর হিসেবে থাকি বা না থাকি, আপোষহীনভাবে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার চাই। এই বিচারের দাবীতে অনেক আন্দোলন আমি করেছি, রাস্তায় মার পর্যন্ত খেয়েছি। আমার এবং আমার মেয়ের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছি। তবে আপনাদের ভালবাসা পেয়েছি, দোয়া, শ্রদ্ধা ও সম্মান পেয়েছি। আপনাদের সকলের কাছে আমার ও আমার মেয়ের কৃতজ্ঞতা রইল। শুধু জানবেন, আমি শত ভাগ সততা দিয়ে প্রসিকিউটর হিসেবে আমার দায়ীত্ব পালন করেছি। জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু

এদিকে ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হতে পারে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের অন্যতম সদস্য প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম। তবে অপসারণ হওয়া প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ দেয়া হয়নি।
প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম বলেন, পেশাগত অসদাচরণের দায়ে তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করবে সরকার। এ ধরনের গুরুতর অসদাচরণ ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে ফৌজদারি অপরাধের দায়ে উপমহাদেশে বা আমার জানা মতে বিশ্বের ট্রাইব্যুনালগুলোর মধ্যে প্রথম কোনো প্রসিকিউটরকে অপসারণ করা হলো। তার কৃতকর্মের জন্য ফৌজদারি অপরাধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে।
ব্যারিস্টার তুরিনের কী ধরনের শাস্তি হতে পারে জানতে চাইলে মালুম বলেন, তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ আনা হবে। তার কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রবিরোধিতার শামিল। কারণ, এটি রাষ্ট্রের অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি প্রতিষ্ঠান। এখন আইন মন্ত্রণালয় বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেবে সেটি তাদের দায়িত্ব।
প্রসিকিউটর মালুম বলেন,প্রসিকিউশন থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পরও তুরিন আফরোজ প্রসিকিউটরদের বরাদ্দকৃত বেতন-ভাতা নিয়মিত গ্রহণ করেছেন। গত মাস পর্যন্তও গ্রহণ করেন। একইভাবে সরকারি গাড়ি, গানম্যান, প্রটেকশন প্রটোকল পেয়ে আসছিলেন এবং তার বাড়িতে হোম গার্ডও পেয়ে আসছিলেন। অপসারণের ফলে তাৎক্ষণিকভাবেই সব সুযোগ-সুবিধাও বাতিল হয়ে যাবে।
পেশাগত অসদাচরণ ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ২০১৬ সালে প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলীকে প্রসিকিউশন থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল। তবে তার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। তিনিও নিয়মিত বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আসছেন বলে জানান প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম।

News Page Below Ad

আরো পড়ুন

Error: No articles to display