আজ বুধবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে সাম্প্রতিক ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বিদেশ থেকে ফিরে প্রতিবারই সংবাদ সম্মেলন করেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। প্রতিবারই সমসাময়িক রাজনীতির বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।এবারেও তিনি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন,তারমধ্য়ে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ প্রসঙ্গে বলেন,এ দেশের প্রতিটি আন্দোলনে সংগ্রামে ছাত্রদের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। বুয়েট চাইলে করতে পারে, আমরা কেন ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করব। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি মনে করে সেখানে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করবে; তারা করতে পারে।
শেখ হাসিনা বলেন, এ দেশের জাতীয় সকল নেতৃত্ব উঠে এসেছে ছাত্র রাজনীতি থেকে। আমি ছাত্র রাজনীতি করেই এখানে এসেছি। এজন্য আমরা দেশের জন্য কাজ করতে পারি।
বুয়েটের ছাত্র আবরার হত্যা প্রসঙ্গে দুঃখপ্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বুয়েটের খবর জানার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে আলামত সংগ্রহের নির্দেশ দেই। যখন পুলিশ আলামত সংগ্রহ করে নিয়ে আসবে তাদের আটকে দেওয়া হলো। তিন ঘণ্টা আটকে রাখা হলো, কেন? সেটা জানা দরকার। অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কিনা। পরে আইজিপি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। আমি সঙ্গে সঙ্গে আইজিপিকে নির্দেশ দিয়েছি কোন রুমে কারা ছিল সবগুলোকে ধরে অ্যারেস্ট করো। যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাবে আমি মেনে নেবো না। ছাত্রলীগকে সঙ্গে সঙ্গে ডেকেছি, নির্দেশ দিয়েছি ব্যবস্থা নেওয়ার।
তিনি বলেন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে। কীসের ছাত্রলীগ, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। কারো দাবির অপেক্ষায় তো আমি বসে থাকিনি। সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ দিয়েছি, গ্রেফতার শুরু হয়েছে। এরপর আন্দোলনই বা কীসের জন্য।
শেখ হাসিনা বলেন, যে বাবা-মা সন্তান হারিয়েছে তাদের কষ্টটা কী সেটা আমি জানি। তাকে (আবরার ফাহাদ) এভাবে ধরে নৃশংসভাবে মারা, এটা কেন। যত রকম শাস্তি আছে সব দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, তারা (বুয়েট শিক্ষার্থী) বলছে, অনেক কিছু স্লোগান দিচ্ছে, আমাদের বিরুদ্ধে অনেক কিছু তারা বলতে পারে, এটা ঠিক। তবে একটু হিসাব করে দেখুন একটা ছাত্রের পেছনে সরকার কত টাকা খরচ করে? একজন ডাক্তার বানাতে কত টাকা খরচ করে, একজন ইঞ্জিনিয়ার বানাতে কত টাকা খরচ করে, একজন গ্র্যাজুয়েট করতে কত টাকা খরচ করে। হিসাব করেন, বের হয়ে যাবে। একবার পার্লামেন্টের ভাষণে কিছুটা আভাস দিয়েছিলাম।
স্বাধীনতা ভালো, তবে তা বালকের জন্য নয়, এমন একটা কথা আছে। যে স্বাধীনতার মর্যাদা দিতে পারবে সেটা তার জন্যই ভালো। এই কথাটা মাথায় রাখতে হবে’ বলেন শেখ হাসিনা।
রাজধানীসহ সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক হলে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, নামমাত্র টাকা ভাড়া দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা ও আবাসিক হলে কারা থাকছে, কারা মাস্তানি করছে তা খতিয়ে দেখা হবে।
ভারতে এলপিজি গ্যাস রপ্তানি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা এখানে বলছেন ’গ্যাস দিয়ে দিচ্ছে, গ্যাস দিয়ে দিচ্ছে’ আর এটা নিয়ে যারা সবচেয়ে বেশি সোচ্চার, বিশেষ করে বিএনপি; আপনাদের একটু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আমি আমেরিকা এবং ভারতে গ্যাস রপ্তানি করতে চাইনি বলে ২০০১-এ ক্ষমতায় আসতে পারিনি। ৫০ বছরের জন্য দেশের জনগণের জন্য গ্যাস সংরক্ষণ করার কথা বলেছি। আর সেসময় বিএনপি গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলো। আমি বলেছিলাম, গ্যাস রপ্তানি করতে পারবে না। সেটা হয়নি। আমার কথা হচ্ছে, যারা প্রশ্নটা তুলে তারা অতীতটা ভুলে যার তাড়াতাড়ি।
বাংলাদেশের কোন স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করবে, এটা কখনও হতে পারে না। বরং যে যে সমস্যা ছিলো (দুদেশের মধ্যে) সেটা আমরাই সমাধান করেছি। আর যে গ্যাস ত্রিপুরাকে দেওয়া হচ্ছে, তা আমদানিকৃত বাল্ক থেকে প্রস্তুতকৃত সিলিন্ডারজাত এলপিজি গ্যাস। এটা আমরা আমদানি করে পরে ভারতে রপ্তানি করছি। আমারা আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি করছি না। এতে বরং আমরা লাভবান হচ্ছি। আমাদের রপ্তানির তালিকায় নতুন আরেকটি পণ্য যোগ হলো।
ফেনী নদীর থেকে ১.৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার প্রসঙ্গে সরকার প্রধান বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ত্রিপুরা আমাদের অনেক সহায়তা করেছে। এটা ভুলে গেলে চলবে না। তারা আমাদের বাস্তুচ্যুত মানুষকে জায়গা দিয়েছে, খাবার দিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দিয়েছে। ত্রিপুরা ছিলো আমাদের শক্তিশালী একটি ঘাটি। তারা কিছু চাইলে আমাদের দিতে হবে। আর ফেনী নদী নিয়ে এতো কথা হচ্ছে-সেটার উৎপত্তিস্থল খাগড়াছড়িতে। ১৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীর মাত্র ৪০ কিলোমিটার আমাদের ভেতর রয়েছে বাকি অংশের পুরোটাই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে। আমাদের মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সীমান্তবর্তী আরও সাতটি নদী রয়েছে। যেগুলো বড় বড় নদী। আর ফেনী নদী থেকে সামান্য ১.৮২ কিউসেক যে পানি প্রত্যাহারের চুক্তি করা হয়েছে, সেটাও খাবার পানির জন্য।
ক্যাসিনো খেলায় অভ্যস্তদের কটাক্ষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যারা এ ধরনের জুয়ায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে,তারা কেউ হয়তো দেশ থেকে ভেগে যাচ্ছে আবার কেউ দিকদ্বিগ ছুটাছুটি করছে- তাদের জন্য এখন একটি দ্বীপ খুঁজে বের করো। সেই দ্বীপে আমরা তাদের জন্য সব ব্যবস্থা করে দেবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভাসানচর অনেক বড় জায়গা। সেখানে ১০ লাখ লোকের বসতি দেয়া যাবে। সেখানে একটা এলাকা তৈরি করে দেব। কারা কারা করতে চায়, একটি নীতিমালা তৈরি করতে হবে। এ ছাড়া লাইসেন্স দিতে হবে, ট্যাস্ক দিতে হবে, তারপর সেখানে গিয়ে ইচ্চামতো করুক। আমার কোনো আপত্তি নেই। সে ব্যবস্থা করে দেব।ট্যাস্ক দিলে ভালো আমরা দেশের উন্নয়ন কাজ করতে পারব।ভাসানচর বিশাল দ্বীপ একপাশে রোহিঙ্গা অন্য পাশে তাদের ব্যবস্থা করে দেব। তারা সবাই ওখানে চলে যাবে। কারণ আমি বাস্তবতা বলছি অভ্যাস যখন বদভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় তখন বারবার খোঁচাখোঁচি করতে হবে। বারবার খোঁচাখোঁচি না করে একটা জায়গায় দিয়ে দেব।এটা সেটা দরকার নেই। সমাজের জন্য ক্ষতিকর, দেশের জন্য ক্ষতিকর। এভাবে তো হয় না। তার চেয়ে ভালো এক চরে পাঠিয়ে দিলাম সব।