দুই ব্যক্তির কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ গতকাল ফাঁস হওয়ার পর নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। পুলিশের বিতর্কিত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমান মিজান দাবি করেছেন, ওই অডিও ক্লিপের দুই ব্যক্তির মধ্যে একজন তিনি নিজে, অন্যজন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির।
তিনি অভিযোগ করেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তকালে ঘুষ বাবদ ৪০ লাখ টাকা নিয়েছেন এনামুল বাছির।

ডিআইজি মিজানের দাবি, গত ১৫ জানুয়ারি থেকে ২ মে পর্যন্ত দুই দফায় (প্রথমে ২৫ লাখ, পরে ১৫ লাখ) ঘুষের এই টাকা লেনদেন হয়েছে রমনা পার্ক এবং পুলিশ প্লাজায় অবস্থিত ডিআইজি মিজানের স্ত্রীর কাপড়ের দোকানে। তিনি বলেছেন, দুদকের ওই পরিচালক ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেছিলেন। এর মধ্যে অবশিষ্ট ১০ লাখ টাকা ছাড়াও তিনি তার সন্তানের স্কুলে আসা-যাওয়ার জন্য একটি প্রাইভেট কারও চেয়েছেন। দুদকের ওই পরিচালক ঘুষের টাকা ব্যাংকে বেনামি অ্যাকাউন্টে রাখার চেষ্টা করছেন বলেও দাবি করেছেন বর্তমানে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত ডিআইজি মিজান।

এদিকে ডিআইজির অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে দুদকের অপরাধলব্ধ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির বলেন, ডিআইজি মিজানুর রহমানের অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তের রিপোর্ট আনুমানিক ১৫ দিন আগে জমা দিয়েছি।

৪০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, তিনি (ডিআইজি মিজান) আমাকে জড়িয়ে এ ধরনের অভিযোগ করাই তো স্বাভাবিক! কারণ তদন্ত রিপোর্টে তার বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে ওনার খুশি হওয়ার কথা নয়, তাই না? মামলা করার প্রস্তাব করায় ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি হয়তো এমনটা করেছেন। এ ছাড়া আপনারা (মিডিয়াকর্মী) আগে থেকেই জানেন, উনি কোন প্রকৃতির লোক। ডিআইজি মিজান সাহেব যে অভিযোগ করছেন, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বলেন, ঘুষ লেনদেন একটি অপরাধ। এ অপরাধে দুজনই সমঅপরাধী। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী ঘুষ গ্রহণ করলে দুদকের চাকরিবিধি


অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হতে পারে।
ঘুষ লেনদেনের সময় রেকর্ডকৃত দাবি করে একটি অডিও টেপ তুলে ধরেন ডিআইজি মিজানুর। এতে দুই ব্যক্তির

কথোপকথন শোনা যায়। ডিআইজি মিজানের ভাষ্য, এ দুজনের মধ্যে একজন দুদকের পরিচালক এনামুল বাছির, অন্যজন তিনি নিজে। সেই কথোপকথনের অংশবিশেষÑ প্রথম জন বলছেন, ’নিয়া আসছেন টাকা? কোন ফর্মে আনছেন? বাজারের ব্যাগে, না?’ অন্য জন জবাব দেন, ’বাজারের ব্যাগে। ওইটার মধ্যে বই-টইও আছে। আইনের বইয়ের মধ্যে এক হাজার টাকার নোটের বান্ডেল। অত বড় ভলিয়ুম না, টোয়েন্টি ফাইভ তো! ব্যাগে আছে। সমস্যা হবে না।’ ... প্রথম জন, ’আমি ভাই আপনার ফ্রেন্ডশিপ চাই, এইটাই হইল কথা। বাকিগুলো?’ অন্য জন, ’না না শোনেন, আর ২৫ লাখ টাকা আমাকে নেক্সট ৮/১০ দিন সময় দিলে আমি ম্যানেজ করে ফেলব।’ প্রথম জন, ’অতদিন সময় দেওয়া যাবে না।’ অপর জন, ’কয়দিন সময় দেবেন?’ প্রথম জন, ’আগামী সপ্তাহে।’
ঘুষের টাকা ব্যাংকে বেনামে রাখতেও তাদের মধ্যে আলোচনা হয় বলে দাবি করেছেন ডিআইজি মিজান। তিনি বলেন, ওই পরিচালক বলেছিলেন, এমন একটা অ্যাকাউন্টে টাকা রাখা দরকারÑ যেখানে আমি নেই বাট আই ক্যান অপারেট। এটা মোটামুটি পারমানেন্ট অ্যাকাউন্টই। এটা ফেক পারসনের নামে ফেক অ্যাকাউন্টও হতে পারে। আপনার মতো যদি আরও কেউ আসে, এ রকম চিপার মধ্যে পড়ি তখন তো আরেকজনের থেকেও আমার নিতে (ঘুষ) হবে। ইন আদার নেম দিয়ে আমি চেকটা সই করলাম। আমার নাম তো দেওয়া যাবেই না। মিজান বলেন, এ সময় তিনি প্রশ্ন রাখেন, ’কার নাম লিখবেন?’ এমন প্রশ্নে পরিচালক নাকি বলেছেন, ব্লাংক থাকবে।
ডিআইজি মিজানের অভিযোগ, এর পর গত ৩০ মে পুলিশ প্লাজায় ডিআইজি মিজানের স্ত্রীর দোকানে যান এনামুল বাছির। সে সময় তিনি জানান, অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এর ভেতরেও (প্রতিবেদন) কিছু পয়েন্ট রাখা হয়েছে। চাপে পড়েই প্রতিবেদন দিতে বাধ্য হয়েছেন দুদকের এ পরিচালক।
মিজানের তোলা অভিযোগের বিষয়ে জানতে গতকাল দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখতের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
দুদক সূত্র জানায়, ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে ২৫ মে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। দুদক আইনের ২০০৪ সালের ২৬(২), ২৭(১) এবং মানি লন্ডারিং আইনের ২০১২ সালের ৪(২) ধারায় মামলার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে এক নারীকে বিয়ে করার অভিযোগে গত ৯ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনারের (ডিআইজি) পদ থেকে মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়। বর্তমানে তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে এক সংবাদ উপস্থাপিকাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও হত্যার হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও ডিআইজি মিজানের নামে-বেনামে শতকোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ পায় দুদক। অভিযোগে বলা হয়েছে, ডিআইজি মিজানের নামে-বেনামে বহু সম্পদ রয়েছে, যা তার আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক।
-আমাদের সময়