অমর্ত্য সেন একজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ভারতীয় বাঙালী অর্থনীতিবিদ ও দার্শনি।নিজ দেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন,ভারতে গণতন্ত্রের অবস্থা ভাল নয়। গোটা দেশ ভয়ে আছে।ইচ্ছা করেই ভারতের বহু ধর্মীয় ও বহুনৃতাত্ত্বিক পরিচয় নষ্ট করার চেষ্টা করছে মোদি সরকার।বহুমুখী আত্মপরিচয়ের সহাবস্থান এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রসঙ্গে অর্মত্য সেন বাংলাদেশের ব্যাপক প্রশংসা করেন।গড় আয়ু ও নারী শিক্ষাসহ অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এখন ভারতের চেয়ে বেশি সফল বলে এমন মন্তব্য করেছেন নোবেল জয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে আবারও সোচ্চার হয়েছেন নোবেলজয়ী অর্থনীবিদ অমর্ত্য সেন। এবার তিনি মোদির জ্ঞানের পরিধি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অমর্ত্য সেনের দাবি, ভারতকে বোঝার মতো জ্ঞান নরেন্দ্র মোদির নেই, তিনি কেবল হিন্দুত্ববাদ বোঝেন।
সম্প্রতি একটি মার্কিন সংবাদপত্রকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ভারত প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এই মন্তব্য করেছেন এই ভারতীয় নাগরিক।
অমর্ত্য সেন বলেছেন, ভারতের ভাষা ও কৃষ্টিগত বহুত্ব সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই মোদীর। অর্থনীতির এই বিশ্ববিখ্যাত অধ্যাপকের দাবি, মোদী একজন স্বপ্রতিভ ও সফল রাজনীতিবিদ। কিন্তু আশৈশব তিনি আরএসএস-এর প্রোপাগান্ডায় বিশ্বাসী।
দেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ভারতে গণতন্ত্রের অবস্থা ভাল নয়। গোটা দেশ ভয়ে আছে। সংবাদমাধ্যমও স্বাধীন নয়, যা আগামীর জন্য মোটেই সুখবর নয়। তবে, তিনি আশাবাদী যে ভারত এই পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াবে।
নোবেলজয়ী বলেন, গণতন্ত্র মানে আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কিন্তু, আলোচনাকেই ভয় পাচ্ছে সরকার। ভোট যে পদ্ধতিতেই নেওয়া হোক, আলোচনাকে ভয়ের বস্তু ভাবলে, গণতন্ত্র অর্জন করা সম্ভব নয়।
এরপরই তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ভারতে এখন কট্টর হিন্দুত্ববাদের দাপট চলছে। মোদি বহু ধর্ম ও জাতির দেশ ভারতকে ঠিক করে বোঝেনই না।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করতে গিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, গোধরা মামলা থেকে নিজেকে মুক্ত করাই মোদির সবচেয়ে বড় সাফল্য। কয়েক হাজারের বেশি মানুষের খুনের ঘটনায় যে তিনি যে যুক্ত ছিলেন, আজকাল অনেকে সেটাই বিশ্বাস করেন না।
ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিরোধীদের কণ্ঠরোধ প্রসঙ্গেও এদিন সরব হন অমর্ত্য সেন। তবে শীঘ্রই এই পরিস্থিতি বদলাবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি।
তার মতে, এখনই সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। এখনও কিছু সাহসী সংবাদপত্র ঝুঁকি নিয়ে খবর করছে। কিছু টিভি চ্যানেল সরকারের সমালোচনা করছে। প্রকাশ্যে বিরোধীরা এখনও সভা করতে পারছে। তাছাড়া ভারত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো। সব রাজ্যে বিজেপি শক্তিশালী নয়। এটাই আশার কথা।
গেটস ফাউন্ডেশন নরেন্দ্র মোদিকে অ্যাওয়ার্ড দেবে এমন খবরে বিস্মিত হয়েছেন বলে জানান অর্মত্য সেন। অর্মত্য সেন বলেন, মাত্র ১২ বছর আগে ২০০৭ সালে আমাদের একজন মুসলিম প্রেসিডেন্ট, একজন শিখ প্রধানমন্ত্রী এবং শাসক দলের একজন খ্রিস্টান নেতা ছিলেন।সে সময় সংসদের বেশিরভাগ সদস্য হিন্দু হলেও কেউ হিন্দুত্ববাদী চিন্তা চাপিয়ে দিতে চাননি। অথচ হঠাৎ করেই আজ আমরা এমন এক পরিস্থিতিতে এসে পড়েছি যেখানে গরুর মাংস খাওয়ার কারণে একজন মুসলিমকে প্রকাশ্যেই নিপীড়ন এবং হত্যা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, অমর্ত্য সেনের বাবা ছিলেন বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পূর্বে ঢাকা থেকে ভারতে চলে যায় তাদের পরিবার। ১৯৪৬ সালে দাঙ্গা পরবর্তী পরিস্থিতিতে তারা দিল্লি চলে যান।
অমর্ত্য সেন মাত্র ২৩ বছর বয়সে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এর অর্থনীতি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা এবং পূর্ণ অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৬০-৬১ সালে ম্যাসাচুসেট্‌স ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাট বার্কলেতে ভিজিটিং অধ্যাপক ছিলেন।
বর্তমানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যামন্ট প্রফেসর হিসেবে কর্মরত অর্মত্য সেন ১৯৭২ সালে তিনি লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স এ অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তার লেখা গ্রন্থাবলী ৩০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।তিনিই প্রথম ভারতীয় শিক্ষাবিদ যিনি একটি অক্সব্রিজ কলেজের প্রধান হন। এছাড়াও তিনি প্রস্তাবিত নালন্দা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসাবেও কাজ করেছেন।