অবশেষে ৫০ ঘণ্টা পর শিক্ষার্থীদের সামনে এলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। মঙ্গলবার আববার হত্যাকাণ্ডের পর শিক্ষার্থীদের তোলা ৭ দফা দাবির প্রেক্ষিতে একটি জরুরী বৈঠক শেষে তিনি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা করেন।
এ সময় তিনি বলেন, ’আমি এই দাবির সবগুলাই প্রায় মেনে নিয়েছি। তোমরা আমাদের ছাত্র-ছাত্রী, তোমাদের শিক্ষার্থীদের মতো আচরণ করতে হবে। এভাবে করলে হবে না। তোমাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে রুমে বসে আলোচনা করতে হবে। বাইরে দাঁড়িয়ে এমন আলোচনা সম্ভব নয়।’
হত্যাকাণ্ডের পর তার অনুপস্থিতির অভিযোগ করে শিক্ষার্থীদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ’আমি তোমাদের জন্যই কাজ করছি এবং করবো। সন্তানরা আর ছোট নেই, তারা বড় হয়েছে। আমি তোমাদের জন্য সারাদিন সরকারের উপর মহলের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা তো সরকারের বাইরে কাজ করতে পারি না, সরকারকে কনভেন্স করে সব করতে হয়।
এ সময় শিক্ষার্থীদের তোলা দাবিগুলো পড়ে শোনানোর দাবি করে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা। তাদের সেই দাবি না মেনে তিনি বলেন, আমি নীতিগতভাবে তোমাদের সঙ্গেই আছি। তোমাদের সবগুলো দাবি আমরা প্রায় মেনে নিয়েছি। তবে সবকিছু আমার হাতে নেই। যে বিষয়গুলো আমার হাতে নেই, সেগুলোতে তোমাদের সাহায্য লাগবে।
এ সময় সোমবার রাতে বুয়েটের ছাত্র হলে পুলিশ প্রবেশের বিষয়ে তিনি বলেন, পুলিশ কাজ আমার হাতে নেই। পুলিশ তাদের কাজ করেছে, তারা ভিডিও ফুটেজ নিয়ে গেছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে এসে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভিসি বলেছেন,আমি তোমাদের অভিভাবক, তোমরা আমার সন্তান। আবরারের সাথে যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটা অনাকাঙ্ক্ষিত।
এ কথা শোনার পর শিক্ষার্থীরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তারা ভিসিকে বলেন,এটা একটা খুন, আপনাকে স্বীকার করতে হবে।
বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম ভিসি ভবনের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে আসেন। পরে তাকে প্রায় ৪০ মিনিট অবরুদ্ধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা।
এ সময় শিক্ষার্থীদের শান্ত হয়ে কথা শুনতে বলেন ভিসি সাইফুল ইসলাম। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা শান্ত হলে ভিসি বলেন, ’আমি শিক্ষামন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছি। তারা দেশের বাইরে আছেন। সেখান থেকে তারা যেভাবে নির্দেশনা দিচ্ছেন আমি তা পালন করছি। আমি তোমাদের দাবিগুলো দেখেছি। এসব নিয়ে তোমাদের শিক্ষকদের সাথে কথা হয়েছে। আমি সব দাবি মেনে নিয়েছে।’
এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী উত্তেজিত হয়ে ভিসিকে বলেন, আবরার খুন হওয়ার পর আপনি কই ছিলেন? গতকাল কেন এখানে আসেননি?
ভিসি বলেন, আমি এখানেই ছিলাম। আমি গত রাত দেড়টা পর্যন্ত কাজ করেছি।
এই বলে ভিসি চলে যেতে চাইলে শিক্ষার্থীরা ’ভুয়া ভুয়া’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। এরপর শিক্ষার্থীরা ভিসি ভবনের নিচে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। ভিসির সাথে বুয়েটের বিভ্ন্নি বিভাগের ডিন ও শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন।
অবরুদ্ধ অবস্থায় ভিসিকে নানা প্রশ্ন করতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। তখন ভিসি বলেন, ’আমি তোমাদের কাছে এভাবে জবাবদিহি করব না। তোমার কয়েকজন আসো, আমি আলোচনা করব।
এটা বলার পর ’শেম শেম’, ’মানি না, মানি না’ বলে বিক্ষোভ করতে থাকেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পরে নানাভাবে বুঝিয়ে উপস্থিত শিক্ষক ও ডিনদের নিয়ে চলে যান ভিসি সাইফুল ইসলাম।
প্রসঙ্গত,রোববার (৬ অক্টোবর) দিবাগত মধ্যরাতে বুয়েটের সাধারণ ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ফাহাদকে শেরেবাংলা হলের দ্বিতীয় তলা থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। সোমবার (৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, বুয়েটের শেরেবাংলা হলের শিক্ষার্থী, সিসিটিভি ফুটেজ ও আটকদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে।
সূত্র জানায়, ফাহাদকে জেরা ও পেটানোর সময় হলের ওই কক্ষে অমিত সাহা, মুজতাবা রাফিদ, ইফতি মোশারফ ওরফে সকালসহ তৃতীয় বর্ষের আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী ছিলেন। ওই কক্ষে এসে দ্বিতীয় দফায় ফাহাদকে পেটান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অনিক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক ও নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একই বর্ষের মেফতাহুল ইসলাম জিয়নসহ কয়েকজন। তারা সবাই মেহেদী হাসান রাসেলের অনুসারী।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে সোমবার সন্ধ্যার পর চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা করেন নিহত আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ্। এ ঘটনায় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ মোট ১১ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

এদিকে বিক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থীরা জানান, আংশিক কোনো দাবি মানা হবে না। দাবি মানা না হলে আগামী ২৪ অক্টোবর বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা বন্ধ থাকবে। আবরার হত্যার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বিক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থীরা।
ভিডিও:জাগো নিউজ