ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েও ভর্তি হতে পারছেন না জমজ দুই বোন-এমন একটি খবর কয়েক দিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ঘুরছিল।তারই পরিপেক্ষিতে শনিবার দুপুরে বাগেরহাট সার্কিটে হাউসে ওই দুই শিক্ষার্থী ও তার মা সাহিদা বেগমের সঙ্গে কথা বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার দায়িত্ব নেয়ার আশ্বাস দেন বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ।এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাগেরহাট সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সরদার নাসির উদ্দিন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কামরুল হাসান, মোহাম্মাদ শাহজাহান, রাহাত উজ্জামান, শিক্ষার্থীদের মা শাহিদা বেগম ও কাউন্সিলর মোল্লা নাসির উদ্দিন প্রমুখ।
পৌর কাউন্সিলর মোল্লা নাসির উদ্দিন জানান, আমার ওয়ার্ডের হরিনখানা এলাকার এই দুই মেধাবী শিক্ষার্থী ঢাবিতে সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি প্রথমে ফেসবুকে পোস্ট দেয়। বিষয়টি অবগত হবার পর শুক্রবার তাদের বিষয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়।
একপর্যায়ে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. মানুনুর রশীদ দেখতে পেয়ে তাদের শনিবার সার্কিট হাউজে ডেকে নিয়ে সহায়তার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
কাউন্সিলর নাসির বলেন, বাগেরহাট পৌরসভার তহবিল থেকে মেয়র খান হাবিবুর রহমানও এ দুই শিক্ষার্থীর পড়াশোনার জন্য ৫০ হাজার টাকা দেওয়ায় ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা পৌরসভার কাউন্সিলর সবার সর্বসম্মতিক্রমেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
শনিবার সার্কিট হাউজে উপস্থিত হলে বাগেরহাট সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সরদার নাসির উদ্দিন মেধাবী ওই দুই শিক্ষার্থীকে দু\’টি সিম্পনী আলফা মোবাইল ফোনও উপহার দেন।
বাগেরহাট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক সরদার নাসির উদ্দিন বলেন, বিষয়টি জানতে পেরে আমি বাগেরহাট-২ (সদর ও কচুয়া উপজেলা) আসনের সংসদ সদস্য শেখ সারহান নাসের তন্ময়কে জানিয়েছি। তিনি মেধাবী এই দুই ছাত্রী নির্বিঘ্নে যাতে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারেন সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলেছেন। আমরা তাদের সহযোগিতার জন্য পাশে রয়েছি।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, তাদের মায়ের সঙ্গে কথা বলেছি তাদের ভর্তির জন্য কত টাকা প্রয়োজন এবং তাদের আর কী সাহায্য দরকার সেটা জানতে চেয়েছি। এ বিষয় সাহিদা বেগম আমাকে বলেছেন দ্রুতই খোঁজ নিয়ে জানাবে। আমরা তার দুই কন্যার জন্য জেলা প্রশাসন থেকে সহযোগিতার কথা নিশ্চিত করেছি তাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাগেরহাট পৌরসভার হরিণখানা এলাকার দিনমজুর মো. মহিদুল হাওলাদারের বসতবাড়ি। ছোট্ট কুড়েঘরে দুই জমজ মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে তার সংসার। মানুষের বাড়িতে রাজমিস্ত্রির যোগাল দিয়ে প্রতিদিন যা উপার্জন করেন তা দিয়েই চলে তার অভাবের সংসার। মহিদুল নিরক্ষর তবে তার স্ত্রী শাহীনা বেগম অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। তাদের জমজ দুই মেয়ে শাহিদা আক্তার সুরাইয়া ও নাদিরা ফারজানা সুমাইয়া শিশুকাল থেকেই মেধাবী। স্কুলে তারা মেধা তালিকায় মধ্যমসারির ছিল। ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে তারা দুই বোন শহরের আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে \’এ\’ গ্রেড পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর তারা ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে সরকারি পিসি কলেজে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ ফাইভ পান।

মা শাহীনা বেগম বলেন, অভাবের সংসারে দুই মেয়েকে অনেক কষ্টে পড়াশোনা করিয়েছি। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ওরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আগ্রহ দেখালে আমার দুশ্চিন্তা যেন আরও বেড়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে যাবে সেই খরচের টাকাই তো আমার নেই। এরপর থেকে পড়ালেখার খরচ চালানো আরও দুঃসাধ্য। কোনো কোচিং ছাড়াই তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়। ওরা ভর্তির সুযোগ পাওয়ায় আমি আনন্দে আত্মহারা হয়েছি। তবে আমার সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি, কারণ আমার তো সামর্থ্য নেই ওদের ভর্তি করে ঢাকায় রেখে পড়ানো।
শাহীনা বলেন, টাকার অভাবে আমাদের এই দুই সন্তানের পড়ালেখা হবে না এই সংবাদ জানতে পেরে বাগেরহাট সদর আসনের সংসদ সদস্য শেখ সারহান নাসের তন্ময় তার প্রতিনিধি পাঠিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। স্থানীয় সাংসদ ও বাগেরহাটের জেলা প্রশাসন আমার দুই মেয়ের পড়ালেখার সব খরচ দেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
শাহিদা আক্তার সুরাইয়া ও নাদিরা ফারজানা সুমাইয়া বলেন, কোনো কোচিং ছাড়াই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিই। তাতেই আমরা কৃতকার্য হয়েছি। ভর্তি পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার পর ভর্তি ফি ও থাকা খাওয়া নিয়ে আমরা দুই বোন দুশ্চিন্তায় পড়ি। কিন্তু স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তামুক্ত করেছেন।

অবশেষে বাগেরহাটের সেই দুই বোনের গতি হলো। তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন সাংসদ শেখ সারহান নাসের তন্ময় ও স্থানীয় জেলা প্রশাসন। দায়িত্ব নিয়েছেন পড়াশোনার সব খরচ নির্বাহের। এতে কেটেছে দুই বোনের দুশ্চিন্তা। তারা এখন আনন্দে ভাসছেন। কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন সাংসদ ও জেলা প্রশাসকের। ভবিষ্যতে তারা শিক্ষক হয়ে জাতির সেবা করতে চান বলে জানিয়েছেন।