টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের ভবনদত্ত গণ উচ্চ বিদ্যালয়ে দুটি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলেও তিন পদের প্রার্থীর পরীক্ষা হয়েছে।
ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আ ন ম বজলুর রহিম রিপন এ ঘটনায় জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে সরকারি বিধি ভঙ্গ করে এ নিয়োগ দিতে মরিয়া তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঘাটাইল উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের ভাবনদত্ত গ্রামে ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ভবনদত্ত গণ উচ্চ বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রধান শিক্ষক ও বিভিন্ন সময়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয়টি পরিচালিত হয়ে আসছে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বিদ্যালয়টির তৎকালীন প্রধান শিক্ষক হায়দার আলী খান অবসরে গেলে পদটি শূন্য হয়। এরপর থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়েই চলছে বিদ্যালয়টি।
২০১৮ সালের শেষের দিকে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে প্রধান শিক্ষকসহ আরও কয়েকটি পদে নিয়োগ দিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক আ ন ম বজলুর রহিম রিপন।
গত ১১ নভেম্বর প্রধান শিক্ষক, অফিস সহকারী ও অফিস সহায়কসহ তিনটি পদে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। তবে বয়সসীমা ৩৫ বছর উল্লেখ করে এ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করায় প্রধান শিক্ষক পদসহ অন্যান্য পদে আবেদন নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। ফলে পরবর্তীতে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি প্রধান শিক্ষক পদ বাদ দিয়ে পুনরায় অফিস সহকারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও অফিস সহায়ক পদে পুনরায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
তবে সেটিও সরকারি বিধি মোতাবেক না হওয়ায় পুনরায় নিয়োগ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে সরকারি বিধি-বিধান না মেনে অফিস সহায়ক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। কিন্তু পদ দুটির নিয়োগ এবং বেতন কাঠামো চূড়ান্ত না হওয়ায় সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
এদিকে, বার বার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেও নানা জটিলতার কারণে নিয়োগ দিতে না পেরে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি আ ন ম বজলুর রহিম রিপন। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে আবারও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
গত ১৬ মে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এমএলএসএস (দফতরি) ও এমএলএসএস (নৈশপ্রহরী) পদ উল্লেখ করা হলেও অফিস সহকারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও অফিস সহায়ক পদ উল্লেখ করা হয়নি। তবে বিজ্ঞপ্তির নিচের অংশে উল্লেখ করা হয়েছে ইতোপূর্বে যেসব প্রার্থী পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও অফিস সহায়ক পদে আবেদন করেছিলেন সেসব প্রার্থীকে অবশ্যই পুনরায় এমএলএসএস (দফতরি) পদে আবেদন করতে হবে। কিন্তু তাদের পুনরায় ব্যাংক ড্রাফট দেয়ার প্রয়োজন নেই।
সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী আবেদনকৃত প্রার্থীদের নামমাত্র পরীক্ষার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করে কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার দুপুরে বিদ্যালয়ে প্রার্থীদের পরীক্ষা নেয়ার সব আয়োজন করা হয়। তবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নিয়ে বিভ্রান্তির দেখা দেয়ায় আগের আবেদনকারী প্রার্থীদের অনেকে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি।
দুটি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলেও তিন পদের প্রার্থীর পরীক্ষা নেয়া, সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে অফিস সহকারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও অফিস সহায়ক পদ উল্লেখ না থাকলেও আগের আবেদনকারী পরিচ্ছন্নতাকর্মী, অফিস সহায়ক পদের প্রার্থীদের পুনরায় একটি পদে আবেদন করার কথা উল্লেখ থাকায় নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।
এতে করে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আগের প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিগুলো বহাল রাখা হয়েছে নাকি বাতিল করা হয়েছে তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দুটি পদের জন্য নাকি তিনটি পদের জন্য তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন প্রার্থীরা। আগের বিজ্ঞপ্তিগুলো বাতিল হলে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে কেন সংশোধনী শব্দটি উল্লেখ নেই এমন নানা প্রশ্ন উঠেছে।
বিদ্যালয়ের নিয়োগ কমিটি সূত্রে জানা যায়, তিন বার প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ফলে প্রধান শিক্ষক পদে ১০ জন, অফিস সহকারী ২৯, এমএলএসএস (দফতরি) পাঁচজন এবং এমএলএসএস (নৈশপ্রহরী) পদে চারজন আবেদন করেন।
বিদ্যালয়ের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, নিয়োগ পরীক্ষা ব্যতীত তিনটি পদে প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে। নিয়োগ বাণিজ্যের বিতর্ক এড়ানোর কৌশল হিসেবে নামমাত্র পরীক্ষার আনুষ্ঠানিকতা চালানো হয় আজ। তিনটি পদে আনুমানিক ৪০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে।
তিনটি পদের প্রার্থীদের কাছ থেকে নেয়া টাকা বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক আ ন ম বজলুর রহিম রিপন, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও নিয়োগ বোর্ডের সদস্য এ কে এম শামসুল হকসহ নিয়োগ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা হয়েছে।
এদিকে, পত্রিকায় দুটি পদে নিয়োগ দেয়ার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও তিনটি পদে প্রার্থী নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অন্যান্য চাকরিপ্রার্থীরা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার বাগুনতা গ্রামের আব্দুল মতিনকে অফিস সহকারী, বাড়ইপাড়া ঢেলুটিয়া গ্রামের মিনহাজকে নৈশপ্রহরী ও বাড়ইপাড়া ঢেলুটিয়া গ্রামের আব্দুল জলিলকে দফতরি পদে চূড়ান্ত করা হয়েছে। দফতরি ও নৈশপ্রহরী পদে চূড়ান্ত দুই প্রার্থীর বাড়ি বিদ্যালয়ের সভাপতির গ্রামে হওয়ায় টাকার বিনিময়ে নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়।
অপরদিকে, পরীক্ষায় অংশগ্রহণের আবেদন করা সত্ত্বেও প্রবেশপত্র না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক প্রার্থী। ক্ষোভ প্রকাশ করে চাকরির আবেদনকারী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, গত ১৩ জানুয়ারি প্রকাশিত বিদ্যালয়ের এ নিয়োগ পরীক্ষার প্রার্থী হিসেবে আবেদন করা সত্ত্বেও আজকে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রবেশপত্র পাইনি আমি।
দফতরি পদে চূড়ান্ত নিয়োগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাড়ইপাড়া ধেলুটিয়া গ্রামের আব্দুল জলিলের বাবা আব্দুল আজিজ বলেন, আমার ছেলেকে নিয়োগ দেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে।
তবে ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে আব্দুল আজিজ বলেন, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আমার আত্মীয়। নিয়োগ বোর্ডের অন্য সদস্যদের অনুরোধে আমার ছেলে আব্দুল জলিলের চাকরি নিশ্চিত হয়েছে।
সন্তোষ ইবি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও নিয়োগ বোর্ডের সদস্য মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, নিয়োগ পরীক্ষায় অফিস সহকারী পদে ১৫ আর বাকি দুটি পদে যথাক্রমে পাঁচ এবং তিনজন প্রার্থী অংশগ্রহণ করেছেন। তবে নিয়োগ বোর্ডের সদস্যরা অবশ্যই প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছতার মাধ্যমে সম্পন্ন করবেন।
টাকার বিনিময়ে নিয়োগ ও নিয়োগপ্রাপ্তদের পরীক্ষার আগেই চূড়ান্ত করার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আ ন ম বজলুর রহিম রিপন বলেন, পরীক্ষায় ভালো করা প্রার্থীদের নিয়োগ দেয়া হবে।
ভবনদত্ত গণ উচ্চ বিদ্যালয়ের নিয়োগ প্রসঙ্গে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও নিয়োগ বোর্ডের সদস্য এ কে এম শামসুল হক বলেন, দুপুরে এই নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্বচ্ছতা আর বৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। তবে দুই পদের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর তিন পদের নিয়োগ পরীক্ষার বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনিও।
বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষার বিষয়ে অবগত নয় জানিয়ে ঘাটাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম বলেন, যদি নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়ে কোনো প্রার্থী অভিযোগ করেন অবশ্যই অভিযোগটি গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে। তবে গুরুতর বিষয়ে অভিযোগকারীদের সরাসরি উপজেলা প্রশাসনকে অবগত করার অনুরোধ করছি।
-জাগোনিউজ